কাটছাঁট সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা

কাটছাঁট সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা
ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক : চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে কাটছাঁট হলো সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক সহায়তা। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে খরচ করতে না পারায় এই অর্থ ফেরত দিয়েছে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো।

চলতি অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ ছিল ৭০ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। এখন সংশোধিত এডিপির জন্য এই বরাদ্দ কমিয়ে ধরা হয়েছে ৬৩ হাজার কোটি টাকা। তবে গত অর্থবছর এই বরাদ্দ ছাঁটা হয়েছিল আরও বেশি। এ অর্থবছর স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি কমেছে বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের বরাদ্দ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। ইআরডি ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে ইআরডির ফাবা (বৈদেশিক সাহায্যের বাজেট ও হিসাব শাখা) উইংয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত সচিব মোস্তাফিজুর রহমান বুধবার যুগান্তরকে বলেন, এ অর্থবছর তুলনামূলক কম কমছে। অন্য বছরে শতাংশের দিক থেকে বেশি ছিল। কোভিড-১৯ মহামারির পরও এ অর্থবছর বৈদেশিক সহায়তা গত অর্থবছরের তুলনায় এবার কাটছাঁট হয়েছে কম। তাই বলা যায়, করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যে টাকা বাদ দিতে হচ্ছে, সেটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মতামতের ভিত্তিতেই। কেননা বছরের শুরুতেই নানারকম প্রত্যাশা থাকে। ফলে বেশি বরাদ্দ ধরা হয়। কিন্তু পরে যখন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, তখন যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হবে না, সেটি তারা কমাতে বলে।

সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে ২ লাখ ১৪ হাজার ৬১১ কোটি টাকা এডিপি বাস্তবায়ন করছে সরকার। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা বা ৬২ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং বৈদেশিক সহায়তা ৭০ হাজার ৫০২ কোটি টাকা বা ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এছাড়া সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন রয়েছে ৯ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা বা ৪ দশমিক ৪১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো বৈদেশিক সহায়তার বরাদ্দ থেকে ব্যয় করতে পেরেছে ১৭ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৪ দশমিক ৯১ শতাংশ।

এছাড়া গত অর্থবছর একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ১৭ হাজার ৫২৬ কাটি টাকা বা ২৪ দশমিক ৪১ শতাংশ। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছিল ১৭ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা বা ২৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ব্যয় হয় ১৯ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা বা ৩২ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৮ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২২ দশমিক ১৫ শতাংশ। এ প্রেক্ষাপটে এডিপি থেকে বৈদেশিক সহায়তা অংশ কাটছাঁট করা হলো।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এডিপি তৈরির সময় অনেক ক্ষেত্রে ধারণার ভিত্তিতে অর্থাৎ কোনো প্রকল্পের বিষয়ে কোনো উন্নয়নসহযোগী সংস্থার কাছে বৈদেশিক ঋণ চেয়ে চিঠি দিয়েই সেটি হিসাবে ধরা হয়। পরে দেখা যায়, ওই প্রকল্পে দাতাদের আগ্রহ নেই। তখন সেই ঋণ আর আসে না। উচ্চাভিলাসী চিন্তা থেকেই বৈদেশিক সহায়তা প্রাক্কলন করা হয় বলেই পরবর্তী সময়ে ছেঁটে ফেলতে হয়। এতে পরিকল্পনা শৃঙ্খলার বিঘ্ন ঘটে। তাই কংক্রিট হিসাবনিকাশ করেই বাস্তবভিত্তিক বরাদ্দ ধরা উচিত।

পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো ইআরডির প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কোভিডের কারণে এই অর্থবছর স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। এডিপিতে স্বাস্থ্য, পুষ্টি জনসংখ্যা এবং পরিবারকল্যাণ খাতে বরাদ্দ ছিল ৪ হাজার ৩২১ কোটি টাকা। সেখান থেকে ৩ হাজার ৫৩৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা বাড়িয়ে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৭ হাজার ৮৫৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

এছাড়া খাত হিসাবে সবচেয়ে বেশি কমেছে বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের বরাদ্দ। এ খাতে মোট বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ১২১ কোটি টাকা। সেখান থেকে ৫ হাজার ৩৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা কমিয়ে সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৮১ কোটি ২৭ লাখ টাকা।

অন্যান্য খাতের বরাদ্দ হচ্ছে-কৃষি খাতে মূল বরাদ্দ ২ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। এখন প্রস্তাব করা হয়েছে ২ হাজার ৫৮২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এছাড়া পল্লি-উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ আছে ৩ হাজার ৬৬৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এখন প্রস্তাব করা হয়েছে ৩ হাজার ৪৮২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। পানিসম্পদ খাতে ৪১৬ কোটি টাকার স্থলে ৬৭৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। বিদ্যুৎ খাতে ১১ হাজার ৫৯৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকার স্থলে ১১ হাজার ১৩৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।

তৈল, গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ খাতে ৭৬২ কোটি ৬৫ লাখ টাকার স্থলে ৮৫৪ কোটি টাকা। পরিবহণ খাতে ১৯ হাজার ৬৩২ কোটি ১৬ লাখ টাকার স্থলে ১৮ হাজার ৩৩৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। যোগাযোগ খাতে ১ হাজার ৩৪ কোটি ২৬ লাখ টাকার স্থলে ৮১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ভৌত পরিকল্পনা ও পানি সরবরাহ খাতে ৬ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার স্থলে ৪ হাজার ৫৬২ কোটি ২৬ লাখ টাকা। শিক্ষা ও ধর্ম খাতে ২ হাজার ২৬৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকার স্থলে ১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। গণসংযোগ খাতে ২২ কোটি টাকার স্থলে সাড়ে ১৬ কোটি টাকা।

সমাজকল্যাণ, মহিলাবিষয়ক ও যুব-উন্নয়ন খাতে ১৯৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকার স্থলে ১৫৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। জনপ্রশাসনে ১ হাজার ৪৯৪ কোটির স্থলে ১ হাজার ২৩৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানে ১৭০ কোটি ৭৬ লাখ টাকার স্থলে ১১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বি আলো / মুন্নী