কুলষিত সমাজে ধর্ষিতা

কুলষিত সমাজে ধর্ষিতা

প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে খবরের কাগজ দেখতে ও টিভি খুলতে ভয় হয়। শুনতে বা দেখতে না হয় আজকেও কারো স্ত্রী, কারো বোন, কারো শিশুকন্যা, কিশোরী, মেয়ে ধর্ষণ বা গণধর্ষণ হয়েছে! গত কয়েক মাস ধরে চলা ধর্ষণের খবর থেকে বোঝা যায় যে, রাজনীতির অপকৌশল যেমন সমাজে ক্যান্সারের ন্যায় ছড়িয়ে পড়েছে, তেমনই ধর্ষকও সমাজে ক্যান্সারের মতো বিস্তার লাভ করেছে।

আর এদের বিস্তার লাভের মূল কারণ, এরা কোনো না কোনো ভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের পদায়িত বা কর্মী। তাই এদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বিশেষ কোনো ব্যবস্থা তো নিতে চায়ই না, বরং যেন কিছুটা সুযোগ করে দেয়। একজন ধর্ষকের পাশে দাঁড়িয়ে একজন আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা যখন সেলফি তুলে সোস্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে, তখন অন্তত সেটাই মনে হয়।


পাপ যখন সব পাপকে ছাড়িয়ে যায়, মিডিয়ায় যখন পাপের কিছু চিত্র ছড়িয়ে পড়ে, শুধুমাত্র তখনই যেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নড়েচড়ে বসে। তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তখন এক ঝলক দেখা যায়। তারা আসেন, এসে বলেন ‘সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে’!

অতঃপর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, কিন্তু এরপর কি হয়, তা আর কেউ জানতেও পারে না! নতুন কোনো ঘটনায় চাপা পড়ে যায় সেই আলোচনা। এদিকে রাজনীতিবিদরা হয়তো বলবে এরা বিরোধীদলের লোক অথবা যদি প্রকাশ পায় নিজ দলের লোক, তখন বলবে ‘এদেরকে দল থেকে বহিস্কার করা হবে’! ব্যাস, সকল দায়-দায়িত্ব শেষ!  যখন এর বিচারকার্য আদালতে উঠবে, তখন ধর্ষণকারী পাবে তারিখ তারিখ আর তারিখ।

আর সেই সব কিছুর জন্যই ধর্ষণ এই সমাজে ব্লাড ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। আর আমরা আমজনতা কলুর বলদের মতো শুনতে থাকব দেশে সুশাসন চলছে। এর বড় একটি উদাহরণ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যেখানে স্বাস্থ্য ভবনে ঢুকতে গেলেই বেশ বড় ব্যানার করে লেখা ‘এটি একটি দুর্নীতিমুক্ত অফিস’। দেখে শুধু হাসলাম, কারণ আমরা আমজনতা! দেখবা, শুনবা, কিন্তু কথা বলতে পারবা না। এ যেন, চোখ থাকিতে অন্ধ, কান থাকিতে বন্ধ! সুতরাং ‘যাহা বলিবে, বুঝিয়া শুনিয়া বলিবে, না হলে জেলের ঘানি টানিতে হইবে’।

কারণ এটা ডিজিটাল দেশ, ডিজিটাল আইন। বেশি কিছু বলিলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তোমার পরিচয় বের করে, গারদে ভরিবে। ধষর্ণের সঙ্গে এই কথাগুলোও বলতে হচ্ছে। বলতে হচ্ছে কারণ, একটি শরীরে যখন ব্লাড ক্যান্সার হয় তখন সেই শরীরের সব অঙ্গে আস্তে আস্তে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ে, ধ্বংস করে দেয় পুরো শরীর। তাই আমাদের এই সমাজটাতেও দিন দিন ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্র।

সেই সঙ্গে রক্ষকরাও ভক্ষক হয়ে বসে আছে মাদকের ওপর। তাই তো এই মাদক শহরের গণ্ডি পেরিয়ে তার বিষাক্ত ছোবল দিয়েছে গ্রাম অঞ্চলেও।  মাঝে মাঝে খবর দেখলে মনে হয়, প্রশাসন ও মাদক মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে! আর তারই ফল আজ ধর্ষণ, হত্যা!  তাই তো আজ ধর্ষণ এই সমাজের বুকে ছড়িয়ে পড়েছে, কুলষিত হয়েছে সমাজ।

না আমি বলব কুলষিত করা হয়েছে সমাজকে। তাই যারাই এই সমাজের মাদক, দুর্নীতি, ধর্ষণকারীর সহায়ক, তারাও কোনো না কোনোভাবে সমাজের ধর্ষণকারীর সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িত। যুক্তিবিদ্যার উক্তি থেকে বলা যায় যে, মুরগি মল খায় আমরা মুরগি খাই।

সুতরাং আমরা মল খাই! তাই যারা এই সমাজকে কুলষিত করছে, সেসব দুর্নীতিবাজ, মাদক কারবারি, অপরাধী, আশ্রয়প্রশ্রয় দাতা, যারা এই দেশ জাতিকে কুলষিত করে চলেছে তাদের বিরুদ্ধে স্বোচ্চার হলে দেশে ও জাতি এই ধরনের ঘৃণ্য ও মনুষ্যত্বহীনতা থেকে দেশ ও জাতি রক্ষা পাবে না। নতুন আইনে ধর্ষণের সাজা ‘যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ড’ করা হলেও কিন্তু সেই বিচার পেতে ধর্ষিতাকে কত বছর ধুঁকতে হবে, তা নির্ধারিত করা হয়নি।

ধর্ষণকারী আইনের বেড়াজাল পেড়িয়ে বছরের পর বছর দিব্বি ঘুরে বেড়ায়। সে সমাজের মাঝে ঘুরে বেড়ায়, টার্গেট করে নতুন কোনো শিকার! এই ধরনের ঘৃণ্য জঘন্য ব্যক্তির বিচার না হওয়ার কারণে সমাজে ধর্ষণের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

তাই আমার মতে, ধর্ষিতা যেমন ধর্ষিত হয়েছে, আইনি ব্যবস্থায় যত দিন না এই ধর্ষণকারীর যথাযথ বিচার না হবে ততদিন ধর্ষিতার কলঙ্কের সঙ্গে সঙ্গে এই সমাজ ব্যবস্থাও কলঙ্কিত হয়ে থাকবে। জানি না এই জাতি আর কত দিন এই কলঙ্কের বোঝা বহন করবে। 
লেখক : শরিফুল আলম তপন, উন্নয়নকর্মী ও ব্যবসায়ী।