কোয়ারান্টাইন নামক কারাগার থেকে বলছি

কোয়ারান্টাইন নামক কারাগার থেকে বলছি

" এখন আমরা সারাবিশ্বের মানুষ চরম খারাপ সময় পার করছি। পৃথিবীও যেন থমকে গিয়েছে আজ।যে দিকেই তাকাই, কান পাতি, শুধুই  করোনা  ভাইরাসের আক্রমণের কথা। মানুষের মৃত্যুর কথা।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের করণে পৃথিবী আজ নিস্তব্ধ। হোম কোয়ারান্টাইনে ছুটির প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এই ছুটিকে বলা হচ্ছে সঙ্গ নিরোধ।একাকিত্বের, নিভৃতে থাকার জেলখানায় বন্দী কয়েদীদের চেয়েও বেশি কঠিন মনে হচ্ছে সঙ্গ নিরোধ।

করোনা ভাইরাস থেকে শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গত ১৮ মার্চ থেকে বন্ধ হয়ে যায় ক্যাম্পাস।তাই ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য এখন সকাল নয়টা বেজে গেলেও কোনো তাড়া থাকে না।

 

বন্ধু ক্লাসে আসতে পারব না আজ! শব্দটি শুনা হয়না অনেক দিন ধরে। বন্ধুদের ফোন করে বলা হয় না আগামীকাল ম্যামের ক্লাস হবে না ।বন্ধুদের বলা হয়না কোথায তুমি ক্লাসে আসতে এতো দেরি হচ্ছে কেন, কোন সমস্যায় আছো কি?আগের মতো বন্ধু- বান্ধবদের সাথে আড্ডাও হয় না। আর ম্যামরা বলেনা তোমরা কাল সিভিলাইজেশ্যন টপিকটা পড়ে আসবা, গ্রুপ ভাগ করে দেয়না ভাইভা, এসাইনমেন্টর জন্য। আজ ভাইয়া ও আপুরা ক্লাসে গিয়ে বলে না যে সবাই সবার সাথে পরিচিত হয়েছো কি? কেউ বলেনা অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের ফোন দিয়ে তাদের অবহিত করতে। কেউ ফোন দিয়ে বলে না যে কোথায় তুমি, কি করো,কেমন আছো?কথা গুলো মনে হলে ভিতরটা কেমন খাঁ খাঁ করে উঠে!

 

ছোট বেলা থেকে শুরু করে এডমিশন জীবনে বহুবার ছুটি পেয়েছি কিন্তু এত দীর্ঘ এবং বেদনা বিধূর ছুটি আগে কখনও পাইনি! তখন ছুটি গুলো ছিল পরিবার, আত্মীয় স্বজন ও প্রিয় মানুষের সাথে একান্তে কাটানোর জন্য এবং কাটাতে পারলেই বেশী ভালো লাগতো। এখনকার ছুটির প্রেক্ষাপট ভিন্ন।এই ছুটিকে বলা হচ্ছে সঙ্গ নিরোধ এর।একাকিত্বের, নিভৃতে থাকার।জেলখানায় বন্দী কয়েদীদের চেয়েও বেশি কঠিন এই সঙ্গ নিরোধ। যদিও মা-বাবা, ভাই-বোন,চাচা-চাচী,দাদী নিয়ে একসাথে শেষ কখন যে কাটিয়েছি তা মনে নেই।

 

আমার কেটে যাচ্ছে ঘুম,নামাজ,ফেসবুক ,ডিপ্রেশন, অসহায় মানুষের পাশে দাড়ানো ও পরিবার কে সময় দেওয়া এই চক্রাকারে। বন্ধু - বান্ধব , শিক্ষক-শিক্ষিকা, সহকর্মী,ভাইয়া,আপু ও অভিভাবকদের সান্নিধ্যে কেটেছে বেশীরভাগ সময়। কিন্তু স্বেচ্ছা কারাবরণের এই সময়ে প্রতিটা সেকেন্ড কাটছে বছরের মতো দৈর্ঘ্যে।

 

কোয়ারান্টাইন শব্দটি প্রথমবার সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে আমার মতো অনেকেরই কয়েক বার রপ্ত করতে হয়েছে! লক ডাউন,আইসোলেশন,হোম কোয়ারান্টাইন শব্দ গুলো আমাদের জন্য নতুন পাশাপাশি আতঙ্কের।

এক অজানা আতঙ্কে গৃহবন্দী থাকতে হচ্ছে পৃথিবীর প্রায় দুই শতাধিক দেশের শত কোটি মানুষকে! যখন লিখছি তখন পর্যন্ত  মৃতের সংখ্যা ৫,১৯৩ আর আক্রান্ত প্রায় ৩৬,০৫৫৫ উপরে। এটা তো হিসেবের কথা এর বাইরে যারা ভয়ে হাসপাতালেই যায়নি অথবা হাসপাতালে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ভর্তি করা হয় নি এই সংখ্যা নির্ধারণ করা আমার পক্ষে অসম্ভব!

কারফিউ জারি করা হয়েছে দেশে দেশে,লক ডাউন করে দেওয়া হয়েছে অনেক দেশে ও বিদেশে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো সড়ক, আকাশ,নৌ পথের যোগাযোগ। বাবা মা সন্তানের মুখ দেখতে পারছিলো না।কিন্তু আবার ও সীমিত পরিসরে সব খুলে দেওয়া হলো। তারপর আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। গোসল দেয়া হচ্ছে না! জানাযা পড়ানো হচ্ছে না,অনেক ক্ষেত্রে লাশ সৎকার করা হচ্ছে ধর্মীয় রীতি নীতি ছাড়াই।বড় বড় মসজিদ মন্দির গুলোতে প্রার্থনা হচ্ছে না স্বস্তির সাথে।তাওয়াফ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো পবিত্র কাবা শরীফে।ডাক্তাররা বাসায় আসতে পারছে না। দেখছে না সন্তানের মুখ। সর্বাত্মক রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সকল দেশ।

 

চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন এর চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করতে।সংক্রমিত এই রোগটি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে পৃথিবীর উন্নত দেশ গুলো নিজেদেরকে সঁপে দিয়েছে সৃষ্টিকর্তার কাছে। অন্যান্য মানুষের মতো বাধ্যতামূলক এই ছুটিতে আমিও ছুটি কাটাচ্ছি আমার প্রিয়জনদের সাথে।এক অনিশ্চিত গন্তব্যে কেটে যাচ্ছে দিন, সামাজিক দূরত্ব বন্ধ করতে তৎপর যৌথবাহিনী,আত্ম রক্ষার্থে সচেতনতার বিকল্প নেই, জনসমাগমস্থল এড়িয়ে, নিজেকে চার দেয়ালে আটকে রাখাই বড় ঔষধ।

 

আমিও সঙ্গ নিরোধ করার চেষ্টা করছি। জোড় করে করে ঘরে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে।খেটে খাওয়া মানুষদের কাছে করোনা ভাইরাস মুখ্য বিষয় না একদিন কাজ করতে না পারলে যে পুরো পরিবারকে উপোস করে মরতে হবে।তাছাড়া মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্রব্য মূল্যের উর্ধগতি।একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্রের। এসব ভণ্ডদের দৌড়াত্বে কমাতে তৎপর প্রশাসন চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে নিরন্তর।

 

কিছুতেই আমার অপেক্ষার প্রহর কাটছে না।কবে শেষ হবে ছুটি? শিক্ষার্থীদের হৈ হুল্লোড়ে মেতে উঠবে পুরো ক্যাম্পাস। স্বাভাবিক হবে মানুষের চলাচল ও দৈনন্দিন কাজকর্ম।প্রতিদিন স্বপ্ন দেখি একটি সুন্দর সকালের যে দিনটা হবে সত্যিই আমার হোম কোয়ারান্টাইন থেকে মুক্তির দিন। সত্যিই খুব মিস করি ফেলে আসা দিন গুলো।একটি সুন্দর সকালের প্রত্যাশায়। 

 

 

লেখকঃ সিনথিয়া সুমি

শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-গোপালগঞ্জ।